সুনামির মতো পানির স্রোতে ভেসে গেছে গ্রাম-জনপদ; নতুন বন্যার শঙ্কায় উদ্ধারকাজে সতর্কতা, ত্রিশূলী উপত্যকায় আটকা শতাধিক
নেপালের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ নিখোঁজের তালিকায় নতুন করে ৯৩৩ জন জলবিদ্যুৎকর্মীর নাম যুক্ত করেছে। দেশটির পার্বত্য এলাকায় বিপুলসংখ্যক জ্বালানি ও বিদ্যুৎ অবকাঠামো প্রকল্প থাকায় এসব প্রকল্পের কর্মীরা দুর্যোগে ব্যাপক ঝুঁকির মধ্যে পড়েছেন। এর আগে নিখোঁজদের তালিকায় ট্রেকার ও তিব্বতের পবিত্র কৈলাস পর্বতে তীর্থযাত্রায় যাওয়া ব্যক্তিদের নামও রয়েছে।
দুর্যোগ থেকে প্রাণে বেঁচে ফেরা মানুষজন জানিয়েছেন, কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তাদের ঘরবাড়ি, সম্পদ ও স্বাভাবিক জীবন তছনছ হয়ে গেছে। এখন নিখোঁজ স্বজনদের কী হয়েছে—এই উৎকণ্ঠায় দিন কাটছে তাদের। একই সঙ্গে শূন্য থেকে নতুন করে জীবন শুরু করার কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছেন তারা।
বন্যা থেকে বেঁচে যাওয়া বুদ্ধি রাম দাঙ্গোল এএফপিকে বলেন, নদীর কাছের সব বসতি পানির স্রোতে ভেসে গেছে। সেখানে এখন আর কিছুই অবশিষ্ট নেই।
নিখোঁজ ভাইয়ের সন্ধানে তিন দিন ধরে অপেক্ষা করছেন সামঝানা থিং। তিনি বলেন, ‘আমরা কিছুই জানি না। আশা করছি, সে নিরাপদ কোনো জায়গায় আছে।’
রেড ক্রস জানিয়েছে, বুধবারের ভয়াবহ দুর্যোগে ব্যাপক মানসিক ও শারীরিক আঘাতের শিকার হয়েছেন মানুষ। এতে প্রায় ৯৩ হাজার মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে থাকতে পারেন। মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
খাবার-পানির সংকট, বাড়ছে নতুন বন্যার শঙ্কা
ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলো থেকে জীবিতদের উদ্ধারে উদ্ধারকারী দলগুলো দ্রুত কাজ করছে। তবে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞের কারণে অনেক এলাকায় খাবার ও বিশুদ্ধ পানির সরবরাহ ফুরিয়ে আসছে।
এরই মধ্যে নতুন করে বন্যার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। প্রবল স্রোতে বরফ ও কাদা জমে বিভিন্ন স্থানে বিশাল জলাধারের মতো পানি আটকে আছে। এর একটি উদ্ধারকাজে নিয়োজিত কর্মীদের জন্য সরাসরি হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
নেপাল পুলিশ সব উদ্ধারকর্মীকে অবিলম্বে নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। তিব্বত প্রান্তে আবারও একটি বাঁধ ভেঙে যাওয়ার তথ্য পাওয়ার পর এ সতর্কতা জারি করা হয়।
ত্রিশূলী উপত্যকায় সুড়ঙ্গে আটকা শতাধিক
নেপাল সীমান্তের দিকে ত্রিশূলী-৩ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের একটি সুড়ঙ্গে কয়েকজন মানুষ আটকা পড়েছেন বলে শনাক্ত করেছে দেশটির সেনাবাহিনী। তাদের উদ্ধারে সুড়ঙ্গে প্রবেশের পথ শনাক্ত করার চেষ্টা চলছে।
নেপালি সেনাবাহিনীর মুখপাত্র রাজা রাম বাসনেত এএফপিকে বলেন, দুটি হেলিকপ্টার পাঠানো হয়েছে। তবে সুড়ঙ্গের প্রবেশপথগুলোই ঠিকমতো শনাক্ত করা কঠিন হওয়ায় উদ্ধারকাজ জটিল হয়ে পড়েছে।
তিনি জানান, ওই এলাকা থেকে প্রায় ৩৫০ জন শ্রমিক ও স্থানীয় বাসিন্দাকে নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। তবে একই এলাকায় আটকা পড়া আরও শতাধিক মানুষকে উদ্ধারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
ত্রিশূলী উপত্যকার অন্যান্য বাঁধ ও জলবিদ্যুৎ প্রকল্প থেকে উদ্ধার হওয়া শ্রমিকরা জানিয়েছেন, খুব অল্প সময়ের মধ্যেই সেখানে ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।
বুদ্ধ তামাং জানান, বন্যার সময় তিনি কর্মস্থলের একটি সুড়ঙ্গের ভেতরে থাকায় প্রাণে বেঁচে যান। ২৪ ঘণ্টার বেশি সময় সেখানে আটকা থাকার পর বৃহস্পতিবার হেলিকপ্টারে করে তাকে উদ্ধার করা হয়। তার ভাষ্য, অন্য পাশে কাজ করা ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সবাই পানির স্রোতে ভেসে গেছেন।
নদীর স্রোতে মরদেহ ভেসে যাওয়ার আশঙ্কা
নেপালে উদ্ধার করা মরদেহের পাশাপাশি দেশটির নদীর স্রোতে ভেসে যাওয়া কিছু মরদেহ ভারতের বিভিন্ন এলাকায় পৌঁছে যাওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। ভারতীয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, নেপাল থেকে প্রবাহিত নদীগুলো থেকে তারা সাতটি মরদেহ উদ্ধার করেছে। এসব মরদেহ বন্যায় ভেসে যাওয়া ব্যক্তিদের বলে ধারণা করা হচ্ছে।
শুক্রবার নেপাল জানিয়েছিল, বন্যা ও ভূমিধসে মৃতের সংখ্যা ৫৭৯ জনে দাঁড়িয়েছে। দেশটির দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের হিসাবে, ১ হাজার ৯২৪ জনের সঙ্গে তখনও যোগাযোগ করা যাচ্ছিল না। তাদের মধ্যে ৫১৭ জন বিদেশি নাগরিক।
কৈলাসযাত্রীদের নিয়েও উদ্বেগ
নেপাল-চীন সীমান্তে নিখোঁজদের মধ্যে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে আসা বহু হিন্দু তীর্থযাত্রীও রয়েছেন। তাদের অনেকেই তিব্বতের পবিত্র কৈলাস পর্বতে তীর্থযাত্রার উদ্দেশ্যে যাচ্ছিলেন।
৪৬ বছর বয়সী শিবরঞ্জনী মুথুনাথান ৫৬ জনের সঙ্গে একটি বাসে করে চীনের সীমান্তের দিকে যাচ্ছিলেন। একপর্যায়ে তারা যানজটে আটকা পড়েছেন বলে মনে করেছিলেন। কিন্তু হঠাৎ পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নেয়।
মুথুনাথান জানান, কুয়াশা ও ধোঁয়ার মতো কিছু একটা হঠাৎ তাদের ঘিরে ফেলে। এরপর প্রবল পানির স্রোত তাদের দিকে ধেয়ে আসে। চারপাশের গাড়িগুলো পানির তোড়ে ভেসে যাচ্ছিল এবং অনেকগুলো কাদার নিচে চাপা পড়ে যায়।
পরিস্থিতি বুঝতে পেরে তারা একজন একজন করে গাড়ি থেকে বের হয়ে পাহাড়ের ওপর উঠে আশ্রয় নেন।
ভয়াবহ এই দুর্যোগে এখনো নিখোঁজ রয়েছেন হাজারো মানুষ। উদ্ধার অভিযান চললেও নতুন করে বন্যার আশঙ্কা, দুর্গম ভূপ্রকৃতি ও যোগাযোগব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় উদ্ধারকারীদের সামনে তৈরি হয়েছে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ।


0 মন্তব্যসমূহ